আজ | শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২০
Search

বরফ রাজ্য লাচুংয়ে

মেঘ বরফের সান্নিধ্যে ক’দিন : ষষ্ঠ পর্ব

লতিফুল হক মিয়া | ১:১২ অপরাহ্ন, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

chahida-news-1582701306.jpg
লাচুং যাবার পথে পাহাড়ি উপতক্যা

হোটেল থেকে গ্যাংটক শহর

১৫ ডিসেম্বর আমাদের ঘুম ভাঙল রানা ভাইয়ের হাঁক ডাকে। তিনি হোটেলের বারান্দা থেকেই দেখতে পাচ্ছিলেন পাহাড়ের এমন অপরূপ দৃশ্য। সেই সাথে সাঙ্গু লেকের বরফময় পর্বত। সূর্য্যমিামার আলো ‘সাঙ্গু লেকে’র বরফময় পর্বতে পরে এক অপার্থিব দৃশ্যপট রচনা করেছে। সেই দৃশ্য দেখে তিনি হতবিহম্বল। ‘এই পাহাড় গলে গেল; বরফ শেষ হয়ে গেল’- ইত্যাদি বলে ডাকছিলেন রানা ভাই। সবাইকে ডেকে ডেকে তিনি দেখাচ্ছিলেন সেই দৃশ্যপট। তার ডাকে সহধর্মনীকে সঙ্গে নিয়ে কক্ষ থেকে বেড়িয়ে আমারও চোখ ‘ছানাবড়া’ হলো। এমন একটি জায়গায় আমরা রাত্রিযাপন করেছি বুঝতেই পারিনি। অবশেষে দৃশ্যগুলোর সঙ্গে ফ্রেমবন্দি করতে সবাই ব্যস্ত হলাম। এরপর প্রাকৃতিক কাজকর্ম সেরে হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়লাম সকালের নাস্তা করতে। স্থানীয় একটি বাঙালি রেস্তেরাঁয় আলু পরাটা আর ডিম ওমলেট খেয়ে হোটেলে ফিরলাম। একটু পরে যাব সেই কাক্সিক্ষত বরফময় পর্বত ‘ইয়ংথান ভ্যালি’ দর্শনে। হোটেলে ফিরে মন খারাপ হলো সবার। আমাদের ৯ জনের টিমে একজন ছিলেন সাংবাদিক। তারটা বাদে বাকী ৮ জনকে অনুমতি দিয়েছেন সিকিমের ভ্রমণ কর্তৃপক্ষ। সাংবাদিকের ভিসায় আলাদা সিল মারা ছিলো- ‘ট্যুরিজম পারপাস। নট ভ্যালিড ফর রিপোর্টিং/ওয়ার্ক’ এই শব্দগুলো দিয়ে। এখানে একজনের নাম বলতে হয়- যিনি সবাইকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তিনি হলেন রানা ভাই। তিনি উদ্দিপনা যুগিয়েছেন ‘ভ্রমণ কর্তৃপক্ষ’র কাছ থেকে অনুমতি সংগ্রহের জন্য। পরে ‘পর্যটক তথ্য কেন্দ্র’-এ যাওয়া হলো। ওখানে ছিলেন একজন ভদ্রমহিলা। তাকে বোঝানো হলো- তিনি সংবাদিক কিন্তু ৯ জনের টিম নিয়ে তো আর সংবাদিকতা করতে আসা হয়নি। আসা হয়েছে ভ্রমণ করতে। তবে ওই ভদ্রমহিলা জানালেন- ‘এটা সংরক্ষিত এলাকা। ওই এলাকাতে সাংবাদিকদের অনুমতি দেয়া হয় না।’ কি আর করার মনখারাপ চিত্তে ফিরলাম হোটেলে। সাংবাদিক ভাইকে গ্যাংটকে রেখেই লাচুংয়ে যাবার প্রস্তুতি নিলেন সবাই। এরই মধ্যে টিমের ৬ জন হোটেল থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে চলে গিয়েছেন। বাকী আছেন রানাভাইসহ আরো দু’জন। হঠাৎ আশার বাণী নিয়ে এলেন ‘হোটেল গ্যালাক্সি’র ম্যানেজার। 

উত্তর সিকিমের লাচংয়ে যাবার পথে ঝর্ণা

তিনি জানালেন, ‘সাংবাদিক ভাইকে দেখে আমার কষ্ট হয়েছে। তাই আমি দায়িত্ব নিয়ে আলাদাভাবে ওনার যাবার ব্যবস্থা করেছি।’ এই খবর শুনে সাংবাদিক ভাই খুশিতে আত্মহারা হয়ে হোটেল ম্যানেজারকে জড়িয়ে ধরলেন। অবশেষে হোটেল থেকে লাগেজ নিয়ে আরেকটি ট্যক্সিতে করে রওনা দেয়া হলো ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে। টিমের সবাই এবার খুশি। ফুল টিম যাব এবার স্বপ্নের রাজ্যে। পরে জানতে পারলাম সাংবাদিক ভাইকে নিয়ে যাওয়ার এই ঝুঁকিটি নিয়েছেন গাড়ি চালক। যিনি আমাদের লাচুংয়ে রাত্রি যাপন, চার বেলা খাবার ও গাইড হিসেবে কাজ করবেন। তার নাম হলো- ‘কর্মা ওজের’, ফোন: ০৭৭৯৭৯৬৪৫৫৭। এখানে ‘কর্মা’ সম্পর্কে একটু বলে রাখা ভালো। কর্মা খুবই বন্ধুভাবাপন্ন একজন যুবক। ২৫ বছর বয়সী তরুণ কর্মা ভালো ইংরেজি ও হিন্দি বলতে পারেন। বাংলা বলতে না পারলেও বুঝতে পারেন। ১৫ হাজার রুপিতেই তিনি আমাদের রাত্রিযাপন, চারবেলা খাবার এবং দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করিয়ে আবার গ্যাংটকে নিয়ে আসবেন।

গ্যাংটকের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে লাচুংয়ের দুরুত্ব ১১৫ কিলোমিটার। এদিন রাত্রি যাপন করব সেখানে। পরের দিন আবহাওয়ার উপর নির্ভর করবে ইয়ংথান ভ্যালি ভ্রমণের। আমাদের জিপটি বেলা ১২টার দিকে ছাড়ল গ্যাংটকের ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে। রৌদ্রজ্জ্বল ঝলমলে দুপুরে আমাদের জিপ ছুটে চলছে এখন লাচুংয়ের দিকে। গ্যাংটক থেকে কিছু অগ্রসর হয়ে পর্বতের সুরঙ্গ ভেদ করে চলছে আমাদের গাড়িটি। পাহাড়ি আঁকা-বাকা পথ। এ পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ছুটছে আমাদের গাড়ি। কর্মা নেপালি, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার গান বাজিয়ে শোনালেন আমাদের। পরে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত তিনি বাজালেন। তার ঝুলিতে বাংলা গানও বেশ সমৃদ্ধ রয়েছে। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের গান শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল। ঘণ্টাখানিক পর কর্মা গাড়ি থামালেন একটি ঝর্ণার নিকট। ১০-১৫ মিনিট ব্যয় করলাম ঝর্ণা দর্শনে। আবার শুরু হলো যাত্রা। এই পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। পাহাড়ি রাস্তার পাশে মাঝে মধ্যে দেখা মিলছে দু’একটি গ্রাম। আবারও কোথাও দু’একটি বাড়ি। আড়াইটার দিকে কর্মা আমাদের পাহাড়ি একটি গ্রামে দুপুরের খাবার খাওয়ালেন। খাবারে ছিলো ডিম, ডাল, ভাজি আর ভর্তা। স্বাদ অতুলনীয়। তিনটার দিকে আবার শুরু হলো যাত্রা। ছুটে চলেছে আমাদের গাড়ি। দূর থেকেই দেখা যাচ্ছিল ইয়ংথান ভ্যালির বরফময় পর্বত। 

উত্তর সিকিমের লাচুংয়ে হোটেলের নীচে লেখক

লাচুং পৌঁছানোর ২০-২৫ কিলোমিটার দূর থেকেই রাস্তার দু’ধারে বরফের স্তুপ দেখা যাচ্ছে। এরমাঝ দিয়েই চলছে আমাদের গাড়ি। মনে হচ্ছিল আমরা যেন ইউরোপের কোনো দেশে যাচ্ছি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আমরা পৌঁছলাম লাচুং’য়ে। রাস্তার পাশেই একটি বাংলোতেই থাকার ব্যবস্থা করল আমাদের ড্রাইভার কাম গাইড কর্মা। হোটেলের চালে ও উঠোনে বরফ জমে আছে। আশে-পাশে খালি জায়গায়ও সাদা বরফের স্তুপ। এবার সত্যিই মনে হচ্ছে এ যেন ইউরোপের কোনো দেশে আমরা পৌঁছেছে। গাড়ি থেকে নামতেই অনুভ‚ত হলো প্রচন্ড শীত। তবে আবহাওয়া অত্যন্ত ভালো যার কারণে গ্যাংটক ও লাচুংয়ে কোনে সর্দি, কাঁশি বা হাঁচি নেই কারোরই। গাড়ি থেকে লাগেজ নিয়ে গেলাম হোটেলে। ওখানকার প্রত্যেকটা টয়লেটেই রয়েছে গিজারের ব্যবস্থা। লাগেজগুলো হোটেলের দুই তলার কক্ষে রেখে আমরা সবাই নামলাম নীচে। কর্মা জানালেন রাত ৮টার দিকে আমাদের রাতের খাবারের ব্যবস্থা হবে। রাতের খাবার খেয়ে পরের দিন ঘোরার জন্য ৫০ রুপিতে গামবুট ভাড়া নিলাম। অনেকেই জ্যাকেট ভাড়া নিলেন ১৫০ রুপিতে। এইগুলো নিয়ে যে যার মতো কক্ষে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। (চলবে...)

আরও পড়ুন:  প্রথম পর্ব, দ্বিতীয় পর্বতৃতীয় পর্ব, : চতুর্থ পর্ব, পঞ্চম পর্বষষ্ঠ পর্ব এবং শেষ পর্ব

  

আপনার মন্তব্য লিখুন