আজ | শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯
Search

গোধূলীতে অপরূপ নীলগিরি

মো. লতিফুল হক মিয়া | ১:৪৬ অপরাহ্ন, ৩১ আগস্ট, ২০১৯

chahida-news-1567237607.jpg

বেশ কয়েক দিন ধরেই বান্দরবানের বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও নৈস্বর্গিক স্থান নিজ চোখে দেখার পরিকল্পনা করছিলাম। কিন্তু একটি গ্রæপ তৈরি করতে পরছিলাম না। সেই সাথে সবার এক সঙ্গে সময় মেলানোটাও হয়েছিল কষ্টসাধ্য। যাই হোক, গত বছরের শরতের এক বৃহস্পতিবার রজনীতে আমি পরিব্রাজক litu mia, সতীর্থ অঞ্জন বিশ্বাস, স্বঘোষিত যাযবর Abid Gipsy এবং মুকুটহীন ‘সুলতান’ সুলেমানকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়েছিলাম নীলগিরি দর্শনে।

বর্ণনা: দেশের ঐতিহ্যবাহী ও ৪ শতাধিক পুরোনো শহর রাজধানী ঢাকা থেকে বান্দরবানের দুরত্ব ৩৩১ কিলোমিটার। আ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২০০ ফুট উচ্চে অবস্থানের কারণে নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্র সর্বদা মেঘমÐিত আর এটাই এই পর্যটন কেন্দ্রের বিশেষ আকর্ষণ। একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে নীলগিরি ধীরে ধীরে দেশব্যাপী মানুষের কাছে পর্যটন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে। এই পুরো পর্যটন কেন্দ্রটিই প্রতিষ্ঠা করেছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং তারাই এর পরিচালনা করে থাকেন। এই পর্যটন কেন্দ্রটি বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে কাফ্রুপাড়াসংলগ্ন পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত। বান্দরবানের আলীকদম থেকে থানচীগামী রাস্তা ধরে পাহাড়ী পথে নীলগিরি পৌঁছানো যায়।

যা দেখবেন: মেঘ ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছা পূরণ করতে চাইলে যেতে হবে বান্দরবানের নীলগিরিতে। নীলগিরি গেলে মেঘ নিজে এসে ধরা দেবে আপনার হাতে। মাথার উপর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা খেলা করে নীলগিরির পাহাড়ে। অপরূপ সৌন্দর্য্যরে এক লীলাভ‚মি এই নীলগিরি। নীলগিরির কারণে বান্দরবানকে বাংলাদেশের দার্জিলিং বলা হয়। নীলগিরির চ‚ড়া থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় ক্রেওক্রার্ড, প্রাকৃতিক আশ্চর্য বগালেক, কক্সাবাজারের সমুদ্র, চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের আলো-আঁধারী বাতি এবং চোখ জুড়ানো পাহাড়ের সারিও দেখতে পাওয়া যায়। নীলগিরির কাছাকাছি রয়েছে বেশ কয়েকটি ম্রো উপজাতীয় গ্রাম। নীলগিরির একদম কাছে কাপ্রæ পাড়া, আপনি সহজেই পরিদর্শন করে ম্রো আদিবাসী সম্পর্কে জানতে পারবেন। নীলগিরিতে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প। ফলে এখানে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই। আপনার যে কোনো প্রয়োজনে সেনা সদস্যরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। যারা এডভেঞ্চার পছন্দ করেন তাদের জন্য রাতের নীলগিরি হতে পারে উৎকৃষ্ট স্থান।

যেভাবে গিয়েছিলাম: অফিস শেষ করে রাজধানী ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে টিপ টিপ বৃষ্টির মধ্যে যখন পৌঁছলাম তখন রাত ১০টা। পরের দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় একটি গাড়িতে এক সঙ্গে চার সিট পাওয়ায় ছিলো দুষ্কর। সরাসরি বান্দরবানে যাবার জন্য কোনো গাড়ির টিকিট আমরা পাইনি। অনেক কষ্টে এস আলম পরিবহনের একটি গাড়ি যাবে সাতকানিয়া। ওই বাসে সর্বশেষ চারটি সিটই ছিলো যা আমরা পেয়েছিলাম। ভাড়া ছিল ৪৫০ টাকা। রাত ১১টায় সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে রওনা হয়ে কাচপুর ব্রিজ পর্যন্ত যেতেই লেগেছিল রাত ১টা। এর পর আবার মেঘনা ব্রিজে অসনীয় যানজট। এই যানজট পেরুতেই আবার দাউদকান্দি ব্রীজেও ভয়াবহ যানজট। সবপেরিয়ে ভোর ৫টা পৌঁছলাম চট্টগ্রামের সীতাকুন্ডে। এরপর বন্দর নগরী চট্টগ্রাম শহর অতিক্রম করে সকাল ৭টায় পৌঁছলাম সাতকানিয়া। সাতকানিয়া থেকে একটি মাইক্রোবাসে কেরানীহাটে যখন পৌঁছলাম সকাল সাড়ে ৭টা। ওখানে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে প্রাকৃতিক কাজ কর্ম সেরে নাস্তা করে আবার ধরলাম বান্দরবান যাবার গাড়ি। বান্দরবান যাবার ৫ কিলোমিটার আগেই আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা পায়ে হেটেই যাব নীলাচলে। সেই মোতাবেকই দীর্ঘ ৫ কিলোমিটার পাহাড়ি রাস্তা ও প্রায় ৮০০ ফুট উচু পাহাড় ট্রাকিং শুরু করলাম। হেটে চলার পথে বিভিন্ন জুম চাষ ও পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। দৃশ্যগুলোর সঙ্গে নিজেদেরও ফ্রেমবন্দি করলাম। যাইহোক নীলগিরি দর্শন শেষে শেষে আবার একটি সিএনজিতে ২০০ টাকা ভাড়ার চুক্তিতে চলে গেলাম বান্দরবান শহরে।

যেভাবে যেতে পারবেন: দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রথমে ঢাকায় আসতে হবে। এর পর ঢাকার বিভিন্ন স্পট থেকে এস আলম, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন পরিবহন, ইউনিক, হানিফ শ্যামলি, ডলফিন ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। জনপ্রতি এসব বাসের ভাড়া নন এসি ৫৫০ টাকা ও এসি ৯৫০-১৫০০ টাকা। ঢাকা থেকে বান্দরবান যেতে সময় লাগবে ৮-১০ ঘণ্টা।

ট্রেনে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গামী সোনার বাংলা, সুবর্ণ এক্সপ্রেস, ত‚র্ণা নিশিতা, মহানগর গোধূলি এইসব ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যেতে পারবেন। শ্রেণীভেদে ভাড়া ৩৫০ থেকে ১২০০ টাকা। এছাড়া ঢাকা থেকে আকাশ পথে সরাসরি চট্টগ্রাম আসতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ভাড়া ২৭০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকম।

চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট থেকে পূবালী ও পূর্বানী নামের দুটি বাস বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাওয়া আসা করে। এ দুটি বাসের জনপ্রতি ভাড়া ২২০ টাকা। চট্টগ্রামের ধামপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে ২০০-৩০০ টাকা ভাড়ায় বাসে করে বান্দরবান যাওয়া যায়।

বান্দরবান থেকে নীলগিরি: পর্যটকদের নীলগিরি যেতে হলে বান্দরবান জেলা সদরের রূমা জীপস্টেশন থেকে থানছিগামী জীপ অথবা বাসে করে নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রে যাওয়া যায়। বান্দরবান জীপ স্টেশন থেকে জীপ, ল্যান্ড রোভার, ল্যান্ড ক্রুজারসহ অন্যান্য হালকা গাড়ি ভায়ায় পাওয়া যায়। নীলগিরি যাওয়ার পথে সেনা চেকপোস্টে নাম ও ঠিকানা লিপিবদ্ধ করতে হবে। বান্দরবান জেলা সদর থেকে সাধারণ বিকাল ৫টার পর নীলগিরির উদ্দেশ্যে কোনো গাড়ী যেতে দেয়া হন না।

আমরা যেভাবে গিয়েছিলাম: বান্দরবান শহর থেকে শৈলপ্রপাত, চিম্বুক পর্বত ও নীলগিরি দর্শনের জন্য রিজার্ভ করেছিলাম একটি মাহেন্দ্র গাড়ি। তাতে ভাড়া নিয়েছিল ১৮০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন: সাধারণ বেশিরভাগ পর্যটক শৈলপ্রপাত, চিম্বুক, নীলগিরি থেকে দিনে গিয়ে দিনেই বান্দরবান ফিরে আসেন। বান্দরবানে হলিডে ইন রিসোর্ট, হিল সাইড রিসোর্ট, হোটেল ফোর স্টার, হোটেল রিভার ভিউ ইত্যাদিসহ অসংখ্য রিসোর্ট, হোটেল-মোটেল এবং রেস্ট হাউজ রয়েছে। যেগুলোতে ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় সহজেই রাত্রি যাপন করতে পারবেন। এছাড়াও সেনানিয়ন্ত্রিত নীলগিরি রিসোর্টে ছয়টি কটেজ রয়েছে। নামগুলো হলো- আকাশনীলা, মেঘদূত, নীলাঙ্গনা, হেতকরা রাইচা এবং মারমারাইচা। কটেজগুলোতে থাকতে হলে পর্যটকদের গুণতে হবে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বুকিংয়ের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর অফিসার পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার রেফারেন্স অবশ্যই লাগবে।

কোথায় খাবেন: বান্দরবানের কাছে হওয়ায় বান্দরবান শহরেই খাওয়া দাওয়া করতে পারবেন। পর্যটকদের খাবারের জন্য বান্দরবন শহরের মাঝারি মানের বেশ কিছু হোটেল রয়েছে। সেগুলো থেকে নিজের পছন্দ মতো হোটেলে তিন বেলার খাবার খেয়ে নিতে পারেন। তার মধ্যে তাজিং ডং ক্যাফে, মেঘদূত ক্যাফে, ফুড প্লেস রেস্টুরেন্ট, রুপসী বাংলা রেস্টুরেন্ট, রী সং সং, কলাপাতা রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি। এছাড়া শৈল প্রপাতে ঝর্ণার সামনেই স্থানীয় নানা মৌমুমী ফল নিয়ে আদিবাসী মানুষজনের দোকান আছে। সেখানে বিষমুক্ত তাজা ফল খেয়ে দেখতে পারেন।

আমরা যেভাবে খেয়েছিলাম: আমরা দুপুরের খাবারের জন্য বান্দরবান শহর থেকেই খাবার কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। ৫০ টাকা প্যাকেজে ভর্তা ভাজি ও ডাল ভাত কিনেছিলাম। দুপুরে শৈলপ্রপাতে গোসল করে প্রপাতের পাশে বসেই খেয়েছিলাম।

আশে পাশের দর্শনীয় স্থান: চিম্বুক পর্যটন কেন্দ্র; নীলগিরি; নীলাচল; মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র; স্বর্ণমন্দির; বগালেক এবং সাইরু হিল রিসোর্ট।

উপদেশ: নীলগিরি পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় চলাচলে সতর্ক থাকুন। একটু অসাবধানতার জন্যে দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। গাড়ি ঠিক করার ক্ষেত্রে দরদাম করে নিন, গাড়ি ওয়ালারা সবাই একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। তাই কৌশলে মুলামুলি করে দরদাম করুন। তেমন হোটেল রুম ভাড়া করার সময়েও। সিজনে ছুটির দিনে গেলে আগে থেকে হোটেল বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন। বিভিন্ন রেস্তরাঁয় স্থানীয় আদিবাসীদের খাবার পাওয়া যায়, স্বাদ নিতে পারেন। বর্ষায় আশেপাশের ঝর্ণায় অনেক পানি থাকে, গোসলে সতর্ক থাকুন। কম খরচে বান্দরবান ঘুরতে চাইলে অফসিজন বা ছুটির দিন ব্যাতিত ভ্রমণ করুন। পাহাড়ি পথে ভ্রমণের সময় সতর্ক থাকুন।

ভ্রমণের খরচ: আমরা চার জন মিলে এই ট্যুর করেছিলাম। এক রাতে যাত্রা করে সারা দিন ঘুরে আবার পরের রাতেই ঢাকা ফিরে এসেছিলাম। কাজেই আমাদের হোটেলে রাত্রি যাপন করার কোনো প্রয়োজন হয়নি। এক্ষেত্রে খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি করে ঢাকা থেকে যাত্রা করে অবার ঢাকায় ফিরে আসা পর্যন্ত জন প্রতি খরচ পড়েছিল ২৩০০ টাকা।

সতর্কতা: আপনি বিন্দু থেকে সিন্ধুতে ঘুরে বেড়ান তাতে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকুন। যেমন পর্যটন স্পটগুলোর পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন। বিশেষ করে ময়লা আবর্জনা, চিপসের প্যাকেন, বিভিন্ন খাদ্য দ্রব্যের প্যাকেট, পানির বোতল, পলিথিন নির্দিষ্ট স্থানে ফেলুন। কারণ পরিবেশই আমাদের সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ। আর প্রকৃতি যদি কোনো কারণে ক্ষিপ্ত হয় তাহলে ‘আইলা’ ও ‘সিডর’র মতো বিভিন্ন টর্নেডো দিয়ে আমাদের ভোগাতে পারে।

  

আপনার মন্তব্য লিখুন