আজ | বৃহঃস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০
Search

রফিক-উল হকের বর্ণাঢ্য জীবন

চাহিদা নিউজ ডেস্ক | ৬:২০ অপরাহ্ন, ২৪ অক্টোবর, ২০২০

chahida-news-1603542043.jpg
ফাইল ছবি

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আর নেই। আজ শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে তিনি রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক দেশ ভাগের আগে ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব থেকে শিক্ষা জীবনের প্রায় পুরোটাই কলকাতায় কেটেছে। লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করে তৎকালীন পাকিস্তানের নাগরিকত্ব নিয়ে তিনি ঢাকায় চলে আসেন।

রফিক-উল হক কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে পড়াকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংস্পর্শে আসেন। ইসলামিয়া কলেজের বেকার হোস্টেলে যে কক্ষে বঙ্গবন্ধু থাকতেন তার পাশের কক্ষেই থাকতেন রফিক-উল-হক। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও কারমাইকেল হোস্টেলে তিনি কিছুদিন বঙ্গবন্ধুর সহচর্যে ছিলেন।

ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক ছাত্র জীবন থেকেই অসামান্য মেধাবী ছিলেন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ক্রিমিনাল ল-তে প্রথম হয়ে স্বর্ণ পদক পেয়েছিলেন তিনি। হিন্দু ল নিয়ে ব্যারিস্টারি পড়েছেন রফিক-উল-হক। খণ্ডকালীন চাকরি করে ব্যারিস্টারি পড়ার খরচ চালাতেন তিনি। স্বাভাবিক গতিতে তিন বছরে ব্যারিস্টারি শেষ করার কথা থাকলেও মাত্র দেড় বছরের মধ্যে সবগুলো কোর্সে পাস করেছিলেন। তাকে দিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু ল পড়ানো শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পরীক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন এ আইনজীবী।

ব্যারিস্টার রফিক-উল-হকের বাবা রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। পারিবারিক ঐতিহ্য থেকেই তিনি ছাত্রজীবনে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পর পর দুবার জিতেছিলেন। এরপর পশ্চিমবঙ্গ যুব কংগ্রেসের ভাইস প্রেসিডেন্ট হন ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক। তখন ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন কেন্দ্রীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতি। রাজনীতির সূত্রে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে, সুযোগ পেয়েছেন একসঙ্গে কাজ করার।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের বাবা মুমিন উল হক পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। চিকিৎসা সেবার বাইরে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি চব্বিশ পরগনা মিউনিসিপালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। কলকাতা শহরও তখন এর অন্তর্গত ছিল। তিনি চব্বিশ পরগনা জেলা মুসলিম লিগের সভাপতি ছিলেন। ডাক্তারি, জমিদারি ছেড়ে গণমানুষের জন্য রাজনীতি করতে গিয়ে নিঃস্ব হতে হয়েছিল তাকে।

ঢাকার ফার্মগেটে ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের দাদার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান। ঢাকা শিশু হাসপাতাল গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন ব্যরিস্টার রফিক-উল। এই হাসপাতালের জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। লটারির টিকিট বিক্রি করে এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার খরচের বড় একটা অংশ সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কাছে কোনো ফি নিতেন না বলে এই হাসপাতালের জন্য আশির দশকে ৫০ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছিলেন। শিশু হাসপাতাল ছাড়াও সুবর্ণ ক্লিনিক, আদ-দ্বীন, বারডেম, আহসানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতালসহ অনেক চিকিৎসাধর্মী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি। রাজধানীর পোস্তগোলায় তার নামে রয়েছে আদ-দ্বীন ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক হাসপাতাল। নিজের উপার্জিত অর্থে গাজীপুরের চন্দ্রায় ১০০ শয্যার সুবর্ণ-ইব্রাহিম জেনারেল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।

ব্যারিস্টার রফিক-উল-হকের বাবার মতো তার স্ত্রী ফরিদা হকও চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬০ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। এ ছাড়া রফিক-উল হকের ভাই-বোনদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন ডাক্তার। বিশ্ব থেকে গুটি বসন্ত রোগ নির্মূলে বিশেষ অবদান ছিল ডা. ফরিদা হকের। এ জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বর্ণ পদক দিয়ে তাকে সম্মানিত করেছিল। ‘কাউ পক্স’ নির্মূলের জন্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে রাশিয়া ও মঙ্গোলিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাকে।

ব্যারিস্টার রফিক-উল-হক ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল নিযুক্ত হয়েছিলেন। সরকারের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হয়েও কোনো বেতন নেননি তিনি। ১৯৬০ সালে কলকাতায় প্রথম মামলা থেকে শুরু করে মাঝে দীর্ঘ ৬০ বছর আইন পেশায় যুক্ত থেকেছেন। এর মধ্যে ১/১১ এর সময় দুই শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া দুজনেরই আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের একমাত্র ছেলে ব্যারিস্টার ফাহিম-উল হকও আইন পেশায় যুক্ত। তার পুত্রবধূ রোকেয়া হকও আইনপেশায় রয়েছেন।

আইন পেশায় থেকে যে বড় বড় মামলায় তিনি লড়েছেন তাতে প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার সুযোগ থাকলেও বস্তুগত বিষয়ের প্রতি রফিক-উল-হকের কখনোই আগ্রহ ছিল না। নিজের ও স্ত্রীর উপার্জিত প্রায় সব টাকা মানব সেবায় দান করে দিয়েছেন। যে বাড়িটিতে তিনি থাকতেন তা তার শাশুড়ি তার স্ত্রীকে ফরিদা হককে দিয়েছিলেন। এ ছাড়া ঢাকায় তার নামে দুটি ফ্ল্যাট আছে। এখান থেকে পাওয়া ভাড়ার টাকায় শেষ জীবনের খরচ চালিয়েছেন তিনি।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের চার ভাই-বোনের মধ্যে বড় ভাই পুলিশ কমিশনার ছিলেন। মেজ ভাই ছিলেন চিকিৎসক। একমাত্র বোনও মারা গেছেন বেশ আগেই। তারা সবাই ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

  

আপনার মন্তব্য লিখুন