আজ | শুক্রবার, ২১ জুন ২০১৯
Search

ভারতে হালিমের নাম পাল্টে রাখা হলো 'দালিম'!

চাহিদা নিউজ ডেস্ক | ৩:১২ পূর্বাহ্ন, ৬ জুন, ২০১৯

chahida-news-1559769155.jpg

এই নাম পরিবর্তনের পেছনে আছে হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুকে কিছুদিন ধরে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বার্তা, যাতে বলা হচ্ছে হালিম আল্লাহরই একটি নাম - কাজেই কোনও খাবারের নাম আল্লাহর নামে হওয়া উচিত নয়।

সুস্বাদু ও পুষ্টিকর হালিম সারা ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি পদ, বিশেষত রোজার মাসে যার চাহিদা থাকে সাঙ্ঘাতিক।

তবে সম্প্রতি কলকাতা, হায়দ্রাবাদ, মুম্বাইয়ের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় এই পদটিকে 'দালিম' নামে ডাকা শুরু হয়েছে, মেনুতেও লেখা হচ্ছে দালিম।

ইসলামিক পন্ডিতরা কেউ কেউ এই মতকে সমর্থনও করছেন, অনেকে আবার বলছেন হালিমের নাম পাল্টানোর কোনও যুক্তিই থাকতে পারে না।

কিন্তু কেন হালিমের নাম নিয়ে বিতর্ক?

কলকাতা শহরের পার্ক সার্কাস, এন্টালি, খিদিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বহু রেস্তোরাঁ তাদের হালিমের জন্য বিখ্যাত, রোজার মাসে হালিমের জন্য সেখানে লম্বা লাইনও খুব পরিচিত দৃশ্য।

কিন্তু দিলখুশা স্ট্রীটের সাইকা, বেকবাগানের জম জমে-র মতো বহু রেস্তোরাঁই ইদানীং এই পদটির নাম পাল্টে করেছে দালিম।

সাইকার কর্ণধার মহম্মদ আসগর আলি কিছুদিন আগে হোয়াটসঅ্যাপে একটি মেসেজ পেয়েই এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন।

ওই ভিডিও বার্তাটিতে হায়দ্রাবাদের জনৈক মুসলিম বাবুর্চিকে বলতে শোনা যাচ্ছে, হালিম আল্লাহরই একটি নাম। কোরানের ২২৫ নম্বর আয়াতেও এর উল্লেখ আছে।

কাজেই আমরা যখন বলি দু'প্লেট হালিম আনো, বা এই হালিম জ্বলে গেল বা কালো হয়ে গেল তখন আমরা আল্লাহর প্রতি কোনও সম্মান প্রদর্শন করি না। আল্লাহর কোনও দাগ লাগে না, কাজেই এই খাবারটিকে দয়া করে হালিম বলে ডাকবেন না।

কলকাতার কিছু রেস্তোরাঁর মতোই হায়দ্রাবাদ বা মুম্বাইয়ের কোনও কোনও এলাকাতেও সম্প্রতি দালিম নামটির প্রচলন শুরু হয়েছে।

তবে কলকাতার বিখ্যাত আর্সালান রেস্তোরাঁ কিন্তু পুরনো হালিম শব্দটিই আঁকড়ে ধরে আছে, তাদের পক্ষে মহম্মদ গুলাম মুস্তাফা জানাচ্ছেন 'হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে পড়া আলেম'দের কথায় তারা এই জনপ্রিয় খাবারটির নাম পাল্টাবেন না।

ভারতের অ্যারাবিক অ্যান্ড ইসলামিক সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের প্রধান মহম্মদ জাভেদ হুসেন আবার দালিমের পক্ষেই রায় দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, "আল্লাহর ৯৯টি নামের মধ্যে একটি হল হালিম - যেটির বানান ও উচ্চারণও অবিকল খাবার হালিমের মতোই।"

যে বা যারা এই খাবারটির নাম রেখেছিলেন, তারা হয়তো সেটা খেয়াল করেননি - কিন্তু আজ আমাদের আরবি ভাষা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান আছে, এখনও কেন আমরা আল্লাহর নামে এই বেরহমতি করে যাব?

তার চেয়ে বরং এই পদটিকে দালিম বলেই ডাকা উচিত, কারণ এটির প্রধান উপাদান হল ডাল।

ভারতের বিখ্যাত ফুড হিস্টোরিয়ান ও গবেষক পুষ্পেশ পন্থ কিন্তু এই যুক্তির সঙ্গে একেবারেই একমত নন।

অধ্যাপক পন্থ বলেন, সারা পৃথিবী যে পদটিকে হালিম বলে চেনে - আমি ধর্মভীরু মুসলিম বলেই সেটির নাম কি পাল্টে দেওয়া যায় না কি?

আমি নিজেও হালিমের ভক্ত - আর আল্লাহর তো প্রায় একশো নাম, তাহলে কত কিছুর নাম আপনাকে পাল্টাতে হবে ভেবে দেখেছেন?

ধর্মপ্রাণ হিন্দু বা খ্রীষ্টানরাও অনেকেই খাবার আগে নিজেদের ঈশ্বরকে স্মরণ করেন, আর খাবারের নামে ওপরওলা জুড়ে থাকলে তাতে কোনও অসম্মান আছে বলেও মনে করি না।

আসলে এটা সৌদি থেকে আসা আগ্রাসী ও বিষাক্ত ওয়াহাবি ইসলামের প্রভাব বলেই আমার ধারণা, বলছেন পুষ্পেশ পন্থ।

কলকাতায় খাদ্যরসিক ও দার্শনিক ড: মীরাতুন নাহার আবার মনে করছেন আল্লাহর নামে নামটা হয়তো বাহ্যিক কারণ - কিন্তু নতুন নাম দালিমের পেছনে ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও দায়ী হতে পারে।

তার কথায়, যতদূর জানি, মুসলিম পুরুষদের প্রায় সব নামই কিন্তু আল্লাহর নামে বা তার বিশেষণে। যেমন রহমান শব্দটা বহু মুসলিমের নামেই আছে - এর মানে হল দয়াময়, যা আল্লাহরই একটা বিশেষণ।

এখন ওপরে ওপরে হয়তো এই কারণটাই বলা হচ্ছে, যে আল্লাহর নামে খাবারটার নাম বলেই এটা বদলানো দরকার - কিন্তু এর পেছনে ভারতীয় মুসলিমদের অন্য আর একটা শঙ্কাও কাজ করছে না তো?

হালিম কিন্তু হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার কাছে ভীষণ জনপ্রিয়। এখন শুধু একটা মুসলিম নামের কারণেই সেই খাবারটা ভারতে আক্রমণের শিকার হতে পারে, কারণ ভারতের রাজনীতিতে এখন এই জিনিসই কিন্তু বারে বারে ঘটছে।

এমন একটা সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই এই জনপ্রিয় খাবারটার নাম পাল্টানোর চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেটাও কিন্তু আমাদের ভাবা দরকার!, বলছেন মীরাতুন নাহার।

তাঁর এ প্রশ্নের উত্তর এখনও নিশ্চিতভাবে জানা নেই - কিন্তু ভারতীয়দের চিরচেনা হালিম যে এখন নতুন নামে টেবিলে সার্ভ হওয়া শুরু হয়েছে, তার পেছনে একটা গূঢ় ধর্মীয় ও সমাজভাবনা কাজ করছে তা কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে।

  

আপনার মন্তব্য লিখুন