আজ | সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯
Search

রোহিঙ্গা ইস্যু ও রাজনীতি

লতিফুল হক মিয়া | ১২:০২ অপরাহ্ন, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

chahida-news-1505974036.jpg

বর্তমানে বিশ্বে সব থেকে আলোচিত ভয়াবহ ইস্যু হলো রোহিঙ্গা। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুর অভিযানের মুখে রোহিঙ্গারা ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে বাংলাদেশে আসছে স্রোতের মতো। জাতিসংঘ ও অন্যান্য সংস্থার মতে এই সংখ্যা ইতোমধ্যে ৫ লাখের কাছাকাছি। কত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছে তার হিসাব এখন আর কারো কাছে মুখ্য নয়। এই সংখ্যা যদি এরমধ্যে পাঁচ লাখ হয়ে থাকে তাহলে অচিরেই তা দশ লাখে পৌঁছতে পারে বলে জাতিসংঘ উদ্বাস্তু সংস্থার পক্ষ থেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। আগে থেকেই আরো কমপক্ষে লাখ পাঁচেক রোহিঙ্গা শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে আছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এবার সম্ভবত রাখাইন থেকে সব মুসলিম রোহিঙ্গাকেই বিতাড়িত করে ছাড়বে। লক্ষণ সে রকমই। এবার তারা রোহিঙ্গা নিশ্চিহ্নকরণ প্রকল্প বাস্তবায়নের ‘মওকা’ পেয়ে গেছে। রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়ে কৌশলী দেশটির শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চি। অপরদিকে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াং’র বক্তব্যে তেমনি ইঙ্গিত মিলছে। তিনি বলেছেন, ‘তারা রোহিঙ্গা হিসেবে স্বীকৃতি দাবি করছে অথচ তারা কখনো মিয়ানমারের নৃগোষ্ঠী ছিল না। এটি ‘‘বাঙালি’’ ইস্যু। আর এই সত্য প্রতিষ্ঠায় আমাদের একতাবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের সরকারি পেজে ১৬ সেপ্টেম্বর শনিবার দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ কথা বলেন।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে পরের দিন রোববার বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান দেশটির উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত সংখ্যালঘু ইস্যুতে দেশের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে শব্দের নাম করণে ‘রোহিঙ্গা’ বা ‘রোহিঙ্গা জাতি গোষ্ঠির’ কল্যাণে এখন বাংলাদেশ-মিয়ানমারও বেশ অলোচিত ও পরিচিতি পেয়েছে। বিশ্বও এখন দুই শিবিরে বিভক্ত হয়েছে। আমরা যারা বাংলাদেশি কিংবা যারা মুসলিম আবার অনেক নন মুসলিম যাদের মন মানবতার হাহাকারে কাঁদে তাদের অনেকেই হয়তো মিয়ানমারের বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের কারণে মিয়ানমারকে গালমন্দ করছি। আবার অনেকেই এহেন কর্মকাণ্ডের উৎসাহ যোগাচ্ছি। কিন্তু সকল কর্মকাণ্ডের পেছনেই একটি লাভ-ক্ষতির রাজনীতি কাজ করছে।

মুসলিম দেশের নেতৃত্বদানকারী গুটি কয়েক দেশ ছাড়া বাকী দেশগুলোও এই বিষয় নিয়ে নিশ্চুপ রয়েছে। মালদ্বীপ মিয়ানমারের সাথে সকল বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া তুরস্কের ভূমিকাও বেশ প্রশংসনীয়। নিশ্চুপ সৌদি আরব। এখানে বিষয় হলো সৌদি কেন নিশ্চুপ? আর তুরস্ক কেনই বা সরব?

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সম্প্রতি কাতার ইস্যুতেও তুরস্ক বেশ বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। এখন রোহিঙ্গা ইস্যুতেও বেশ বলিষ্ঠ। তার দেশের ফার্স্ট লেডি এমিনে এরদোয়ান ইতোমধ্যে রোহিঙ্গাদের দুর্বিসহ জীবন স্বচক্ষে দেখতে কক্সবাজারের উখিয়া এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি তুরস্কে ফিরে গিয়ে ফার্স্ট লেডি বিশ্বের রাষ্ট্রপধানদের স্ত্রীদেরকেও রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে আহ্বন করেছেন। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও বিশ্বের বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথেও রোহিঙ্গা নিয়ে কথা বলেছেন। তবে এখানে বিষয় হলো- ক. তুরস্ক মানবতার খাতিরে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। খ. রোহিঙ্গারা মুসলিম হওয়ায় তুরস্ক আরো জোরালো হয়েছে। ৩. তুরস্ক মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে যেতে যাচ্ছে। যেখানে সৌদি নিশ্চুপ রয়েছে সেক্ষেত্রে তুরস্ক এই ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের কাছে বার্তা দিতে চাচ্ছে- মুসলিম ইস্যুতে তুরস্ক বেশি তৎপর। সৌদি নিশ্চুপ থাকার বিষয়েও রয়েছে রাজানীতি ও অর্থনীতি। মংডুতে অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে। এটাতে চুক্তি করতে যাচ্ছে মিয়ানমারের রাজ্য সরকার। আর সেই অর্থনৈতিক অঞ্চলে সৌদিসহ বেশ কয়েকটি জোটের বিনিয়োগ করার খবর শোনা যাচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে নিশ্চুপ সৌদি।

আবার ইরান এই বিপর্যয়ে ত্রাণ দিতে চাচ্ছে। সম্প্রতি কাতার ইস্যুতেও ইরান কাতারের পাশে ছিল। তার আগে রিয়াদে প্রায় অর্ধশত মুসলিম দেশের প্রধানদের নিয়ে ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স (আইএমএ) বা দ্য ইসলামিক মিলিটারি অ্যালায়েন্স টু ফাইট টেররিজম (আইএমএএফটি) জোট গড়ে সৌদি। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আসল বিষয় হলো- এই জোট ছিল এক প্রকার ইরানের বিরুদ্ধে। এই রকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি কাটাতে ইরান ‘কাতার ইস্যুতে’ কাতারের পাশে দাঁড়ায় এবং সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়ায়। এখানে যা দাঁড়াচ্ছে ‘একঘরে’ ইরানও বিভিন্ন সুযোগে জোট গঠনে কাজ করছে। তারাও বিশ্বে নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তির জানান দিতে চায়।

আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরএসএ) সন্ত্রাসবাদের কারণেই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মুসলিম রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে-

বিষয়টিকে এত সরলভাবে না দেখে এর পেছনে অন্য ‘রহস্য’ দেখেছে দেশটির বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমও।

চীন, রাশিয়া, ইসরায়েল এবং ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। তার বড় কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে রোহিঙ্গাদের জঙ্গি বা সন্ত্রাসী কানেকশন। সব রোহিঙ্গা অবশ্যই জঙ্গি বা সন্ত্রাসী নয়। তারপরও রোহিঙ্গাবিরোধী ঢালাও অভিযানকে হালাল করার জন্য মিয়ানমার জঙ্গি ইস্যু সামনে আনছে। রোহিঙ্গারা যেহেতু বেশির ভাগ ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে মুসলমান এবং ইসলামের নাম করে যেহেতু বর্তমান সময়ে দেশে দেশে ভয়ানক ও ভীতিকর শক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, সেহেতু রোহিঙ্গারাদের একটি নাজুক অবস্থার মধ্যে ফেলানো হয়েছে। ‘জঙ্গিবাদী’ ইস্যুকে সামনে এনে যদিও এখন একধরনের ক‚টনৈতিক মদদ দিচ্ছে মিয়ানমারের মিত্ররা। এর পেছনেও রয়েছে বিভিন্ন রাজনীতি ও অর্থনীতির কারবার।

বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাথে যদিও বরাবরই ভারতের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারাও যেন মুখে কুলুপ দিয়েছে। যদিও ঢাকার সাথে দিল্লির যোগাযোগে দিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকার পাশেই থাকার আশ্বাস মিলছে। কিন্তু বাস্তবে ভিন্নতা পাওয়া যাচ্ছে। এর পেছনেও বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে ১৯৪৮ সালে স্বাধীন হওয়ার পর মিয়ানমারের রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা তৈরি করে দেশটির সেনাবাহিনী। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এবং বিশ্বের যেকোনো স্বাধীন দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সময় রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তাই সামরিক জান্তা তাদের ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদী করতে বেশকিছু বিশ্বস্ত মিত্র তৈরি করেছে। তাদের কাছ থেকে আধুনিক অস্ত্রও সংগ্রহ করেছে। এই তালিকায় রয়েছে ভারতও। কাতার ভিত্তিক সংবাদ মাধ্যম ‘আল জাজিরা’ এই নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের খবরই বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আবার ভারতও দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভ‚-রাজনীতিতে প্রভাব খাটাতে চায়। সেই সাথে তো অর্থনীতি রয়েছেই।

চীনের কাছ থেকেও এতদিন মিয়ানমার বিভিন্ন দামি দামি অস্ত্র সংগ্রহ করেছে। সে দিক থেকেও মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে চীন। বাংলাদেশও চীনের কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করে। বাংলাদেশের সাথে চীনের বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক সকল সরকারের সাথেই ভালো। তবে চীন বাংলাদেশের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখে ভূরাজনীতি ও ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করেই। বাংলাদেশের অনেক বড় বড় অবকাঠামো চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে যেমন পদ্মা সেতু। এছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও চীনা ইলেক্ট্রনিক পণ্যের বড় একটি বাজার রয়েছে। বাংলাদেশের সরকারও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন নেয়ার জন্য চীনাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে। তবে রোহিঙ্গা পরিস্থিতিতে ভিন্নতা। এখানে রয়েছে বর্তমান লাভ-ক্ষতির হিসাব।

মিয়ানমারের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম বলছে, ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরুর পর তড়িঘড়ি করে ৫ সেপ্টেম্বর একটি কোম্পানি গঠন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় নাফ রিভার গ্যালাক্সি ডেভেলপমেন্ট নামের ওই কোম্পানির সঙ্গে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের দিন ঘোষণা করা হয়েছে। মিয়ানমারের ফ্রন্টিয়ার ইরাবতি পত্রিকায় এমন তথ্যই প্রকাশ করেছে।

মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নিধনের পেছনে শুধু কিছু বিদ্রোহীর কর্মকাণ্ডই দায়ী নয়; বরং সেখানে রয়েছে বিশাল বাণিজ্যের খেলা। মিয়ানমারে তেল ও খনিজ সম্পদে ভরপুর। চীনা বিনিয়োগকারীরা বঙ্গোপসাগরের পাশে রাখাইন রাজ্যে খনিজ সম্পদ আহরণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও পাইপলাইন নির্মাণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বন্দর নির্মাণ করতে চায়। মিয়ানমারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে চীনের বড় ধরনের অবদান আছে। একই সঙ্গে সেখানে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছেই।

মংডুতে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। রাখাইন রাজ্যের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী ইউ কায়া আয় থেনের গণমাধ্যমে দেয়া বক্তব্যে এর সত্যতাও মিলছে। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হচ্ছে নাফ নদের পাশে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা কানইয়ান চাউং গ্রামে। মন্ত্রী ইউ কায়া আয় থেনের গণমাধ্যমে আরো বলেছেন, আগের সরকারই সেখানে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বর্তমান সরকার সেই পরিকল্পনাকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে। এটি হবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, যেখানে বিনিয়োগকারীরা জমি লিজ পাবেন অত্যন্ত কম দামে। তাদের কোনো কর পরিশোধ করতে হবে না।

স্থানীয় গণমাধ্যম ‘ফ্রন্টিয়ার’ নাফ রিভার গ্যালাক্সি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপকে রহস্যময় হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে অর্থনৈতিক গ্রুপের পেছনে কারা রয়েছে তা অস্পষ্ট। ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই তড়িঘড়ি করে ৫ সেপ্টেম্বর এই কোম্পানিকে নিবন্ধিত করা হয়েছে। অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হবে যৌথভাবে। সেখানে সাতজন বড় ব্যবসায়ী বিনিয়োগ করবে। তারা মংডু ও ইয়াঙ্গুনের ব্যবসায়ী। কিন্তু ওই সাতজন বড় ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করেননি মন্ত্রী। এখানেই সন্দেহের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। চীনা বিনিয়োগকারীরা জড়িত থাকতে পারেন নাফ রিভার গ্যালাক্সি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপের সঙ্গে এমন সন্দেহ অমূলক নয়।

রাখাইন রাজ্যে আরেক শহর কিয়াপফুতেও চার হাজার একর জমিতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। সেখানকার তেল ও গ্যাস টার্মিনালেও অর্থায়ন করেছে চীনের পেট্রোলিয়াম করপোরেশন। জমি অধিগ্রহণের সময় জমির মূল্য পরিশোধ না করারও অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

মিয়ানমারের আরেকটি পত্রিকা ইরাবতিতে ১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেছে, প্রথম পর্যায়ে রাখাইন রাজ্যে ১০০ একর জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে মিয়ানমার সরকারের। পরবর্তী সময়ে সেটি আরো বাড়ানো হবে। তবে সা¤প্রতিক সহিংসতার কারণে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ কিছুটা ব্যাহত হয়। সহিংসতা কমে গেলে পরিস্থিতি শান্ত হলে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজে গতি বাড়বে।

রাখাইনের রাজ্য সরকার বলছে, মংডু অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে পারবে। তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। রাজ্য সরকারের এই বক্তব্যেই প্রমাণিত হয় যে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে চীনা বিনিয়োগকারীরা সরাসরি জড়িত আছে। মিয়ানমারে চীনের যে বড় ধরনের বিনিয়োগ পরিকল্পনা রয়েছে, সেটি ফুটে উঠেছে গত ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিয়াংয়ের বক্তব্যে। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের চলমান সহিংসতার কারণে চীন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ সেখানে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চীনের সমন্বয়ে (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়নও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে; ঠিক তেমনটি রয়েছে মিয়ানমারের সঙ্গে। অবশ্য চলমান সহিংসতা অতি দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে বলে আশাবাদী চীনের রাষ্ট্রদূত। চলমান সংকটে বাংলাদেশের পক্ষে না দাঁড়িয়ে চীন সরকার এরই মধ্যে মিয়ানমারের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে। আর এর পেছনে মিয়ানমারে দেশটির বড় ধরনের স্বার্থ রয়েছে বলে মনে করা অযৌক্তিক নয়।

রাখাইন রাজ্যে চলমান সংকটের পেছনে বহুমাত্রিক কারণ রয়েছে বলে রুশ সংবাদমাধ্যম স্পুনিকের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ব্রিটিশ প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানেও বলা হয়েছে, এর পেছনে রয়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থ। গার্ডিয়ানে বলা হয়েছে, মিয়ানমারে প্রচুর খনিজ সম্পদ রয়েছে। সেখানকার কৃষি খাতও সম্ভাবনাময়। ২০১২ সালে মিয়ানমার সরকার তাদের সংসদে একটি আইন পাস করেছে, যেখানে শতভাগ বিদেশি মূলধন আনার পাশাপাশি ৭০ বছরের জন্য জমি লিজের সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে বিদেশি অনেক ব্যবসায়ীর কাছে মিয়ানমার এখন বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র হিসেবে ধরা হচ্ছে।

ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ অব দ্য রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেসের সেন্টার ফর সাউথ ইস্ট এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়াবিষয়ক পরিচালক দিমিত্রি মোসিয়াকভের মতে, রাখাইন রাজ্যের উপক‚লীয় এলাকায় হাইড্রোকার্বনের বিপুল রিজার্ভের দিকে চোখ রয়েছে আন্তর্জাতিক মহলের। মোসিয়াকভ বলেন, মিয়ানমারের সাবেক সেনাশাসক থান শুয়ের নামে অনেক গ্যাস ক্ষেত্র রয়েছে। পাশাপাশি আরাকানের উপকূলীয় অঞ্চলে হাইড্রোকার্বন রয়েছে বলে অনেকটাই নিশ্চিত। স্পুনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৪ সালে রাখাইনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানিসম্পদের সন্ধান পাওয়ার পর সেখানে চোখ পড়ে চীনের। ২০১৩ সাল নাগাদ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজও শেষ করে দেশটি। পাইপলাইন মিয়ানমারের বন্দর শহর কিয়াউকফিউকে চীনের ইউনান প্রদেশের শহর কুনমিংকে যুক্ত করেছে। তেলের এ পাইপলাইনের মাধ্যমে পেইচিং মালাক্কা প্রণালি হয়ে মিডল ইস্টার্ন ও আফ্রিকান তেল সরবরাহের সুযোগ পায় পেইচিং। আর গ্যাস পাইপলাইনটি ব্যবহার করা হয় মিয়ানমারের উপক‚লীয় ক্ষেত্র থেকে চীনে হাইড্রোকার্বন সরবরাহের জন্য। নতুন করে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে এমনটি ভাবলে দোষ কী?

এখন থাকল রাশিয়া ও ইসরায়েল। রাশিয়া ও ইসরায়েলের কাছ থেকে মিয়ানমার অস্ত্র সংগ্রহ করে থাকে। যদিও রাশিয়ার সাথে বরাবরই বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সম্পর্ক ভালো। তবুও ক‚টনৈতিক মহল বর্তমান ও ভবিষ্যতের লাভ-ক্ষতির হিসাব কষে থাকে। এছাড়া ইসরায়েলের সাথে বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। সেই দিক থেকে তারা রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সাথে থাকবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসাকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ শরণার্থী সংকট বলছে জাতিসংঘ। গত পাঁচ বছরের মধ্যে এবারই এত বিপুলসংখ্যক লোকজন প্রাণ বাঁচাতে তাদের খূখণ্ড ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।

এমনিতে সাম্প্রতিক সময়ে বন্যায় বাংলাদেশের ব্যাপক ফসলহানি হয়েছে। মোটা চালের কেজি পঞ্চাশ টাকায় পৌঁছেছে। তারপর আবার দশ-বিশ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা বহন করা বাংলাদেশের জন্য অনেক কষ্টকর। যেসকল রোহিঙ্গা বাংলাদেশে রয়েছে তারাও অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করছেন। যারা বাংলাদেশে এসেছেন তাদের অনেকেই নিজেদের স্বজনকে হারিয়েছেন। অনেক নারী তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যারা রয়েছেন তারাও অনাহারে-অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন। প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ অপ্রতুল। যারা শারিরীকভাবে দুর্বল বিশেষ করে বৃদ্ধরা ত্রাণ সংগ্রহ করতে না পেরে অভুক্ত থাকছেন। এছাড়াও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। প্রয়োজন মাফিক পানি না পেয়ে অপরিস্কার নর্দমার পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেই বিভিন্ন অসুখে-বিসুখে ভুগছেন। আমার মতে এহেন পরিস্থিতিতে উখিয়ার ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অর্ধেক অংশ খাবার ও চিকিৎসার অভাবে মারা যাবে। কিন্তু বাংলাদেশে আসার পূর্বে তাদের অনেকেরই সুখী ও সমৃদ্ধ জীবন ছিল। কিন্তু এখন তারা শরনার্থী। যে সকল আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা ত্রাণ সরবরাহ করছেন তারাও একটা সময়ে এই পরিমাণ ত্রাণ সরবরাহ করা থেকে বিরত থাকবেন। বাংলাদেশের আনাচে কানাচে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। অনেকেই আবার এই সুযোগে চাদাবাজি করছেন। মানবিক কারণ দেখিয়ে অনেকেই ত্রাণ দিচ্ছেন। কিন্তু একটা পর্যায়ে জনসাধারণও ত্রাণ দেয়া থেকে বিরত থাকবেন। তখন কি হবে রোহিঙ্গাদের? তখন জীবন বাঁচার তাগিদে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কাজে লিপ্ত হবে। বাংলাদেশিরা যারা এখন সহানুভূতি দেখাচ্ছে তারাও পরে গালমন্দ করবে। যা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের জন্য ক্ষতিকর। একটি জেলার ওপর এতগুলো লোকের চাপ সামলানো এমনিতেই অনেক কষ্টের। সেখানে ইতোমধ্যে দ্রবমূল্যের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টাকা দিয়েও নিত্যপণ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এখনই রোহিঙ্গারা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে সমস্যা তৈরি হবে বাংলাদেশের সর্বত্রই।

রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও কম রাজনীতি হচ্ছে না। ইতোমধ্যে বিএনপির ত্রাণবাহি ট্রাক আটকে দিয়েছে পুলিশ। ইসলামী দলগুলো প্রতিদিনই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। কয়েকটি ইসলামী দল জিহাদের ডাক দিয়েছে। এমন ডাক অমূলক নয়। এমন ডাকেই আফগানিস্তানে মুজাহেদিনরা প্রায় এক যুগব্যাপী যুদ্ধ করেছে। সংখ্যায় কম হলেও পিছিয়ে নেই বিপ্লবীরাও। তারাও একরকম বিপ্লবের ডাক দিয়েছে। বাম দলগুলোও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারমুখী করতে আন্দোলন করছে।

প্রথম দিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ‘বিজিবি’ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রোহিঙ্গা প্রবেশে কঠোর অবস্থান নেয়। পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। বাংলাদেশ সরকার তাদের মানবিক কারণ দেখিয়ে স্থান দেয়। এর পেছনেও রাজনীতি রয়েছে। এর আগে হাসিনা সরকার ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে শান্তি চুক্তি করেছিল। এই চুক্তির পেছনে ক্ষমতাসীনরা ভেবেছিল এই বুঝি এইবার শেখ হাসিনা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাবেন। কিন্তু তা হয়নি। পরবর্তীতে তাদের কথা বার্তায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হয়। এবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। সেখানে তিনি রোহিঙ্গাদের দুঃখ দুর্দশা স্বচোক্ষে দেখেছেন। তবে এরপরই শেখ হাসিনার নিজস্ব ফেসবুক পেজে দেখা গিয়েছে, ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার ২০১৭ এর জন্য মনোনীত ১০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা’ শিরোনামে একটি খবর। যদিও এ খবরের ভিত্তি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যও যথেষ্ট সন্দেহ পোষণ করেছে। তবু রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে ভূমিকা নিয়েছেন- তা অবশ্যই প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান এটি অবশ্যই আমিও চাই। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে- রোহিঙ্গাদের নিয়ে এমন মানবকি আচরণ যেন শুধু নোবেল পুরস্কার পাওয়ার জন্য না হয়। পুরস্কার পাওয়ার পর যেন রোহিঙ্গারা ক্যামেরার আউট অব ফোকাস না হয়। রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে ফেরাতে অবশ্যই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভূমিকা রাখতে হবে। তাতে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি উভয়েরই লাভ হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

  

আপনার মন্তব্য লিখুন