আজ বুধবার, ২০ জুন ২০১৮ |
Search

প্রচ্ছদ বিদেশ ট্রাম্প-কিম বৈঠকের সফলতা নিয়ে নানা সংশয়, বহু প্রশ্ন

৪৪  বার পড়া হয়েছে

ট্রাম্প-কিম বৈঠকের সফলতা নিয়ে নানা সংশয়, বহু প্রশ্ন

অনলাইন | ৭:৪০ অপরাহ্ন, ১১ জুন, ২০১৮

  

chahida-news-1528724419.jpg

একসময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তর কোরীয় নেতা কিং উনকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ছোট্ট রকেট মানব’ ও ‘খাটো মোটকু’। বিপরীতে কিম ট্রাম্পকে ডেকেছিলেন ‘ভীত কুকুর’ ও ‘মানসিক ভারসাম্যহীন বুড়ো’নামে। টুইটার পোস্ট কিংবা রাষ্ট্রীয় বিবৃতিতে তাদের পারস্পরিক বিষেদগারের সাম্প্রতিক অতীতও কমবেশি সবার জানা। সেইসব অতীতকে পেছনে রেখে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যাবধান ১২ জুন বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টায় সিঙ্গাপুরে বৈঠকে বসছেন কিম-ট্রাম্প। অনুষ্ঠিতব্য সেই বৈঠকেই এখন নজর রাখছে সারা বিশ্ব। ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ায় নিরীক্ষাযোগ্য, স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ চান। অন্যদিকে কিমের প্রত্যাশা, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওপর আরোপিত করা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে, কোরীয় উপদ্বীপে মার্কিন সেনা উপস্থিতি বন্ধ করবে এবং দেশটিকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেবে। তবে মতপার্থক্য দূর করে তারা কোনও সমঝোতায় আসতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক পরম্পরা লিবিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ইতিহাস আর সিরিয়ার বাস্তবতা উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে অনুৎসাহী করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আর তারা যদি নিরস্ত্রীকরণে রাজিও হয়, এর বিপরীতে ট্রাম্প কিমের প্রত্যাশা পূরণ করবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

কিম-ট্রাম্প পরমাণু আলোচনায় তাকিয়ে বিশ্ব

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মেনে নিলে উত্তর কোরিয়াকে চিরকালের জন্য পরমাণু অস্ত্র গবেষণা বন্ধ করে দিতে হবে এবং তারা সেটা করেছে কি না তা পরীক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা নজরদারি করার ক্ষমতা পাবেন। কিন্তু ইতিহাস বলে উত্তর কোরিয়া তাতে কোনও দিনও খুব একটা উৎসাহী ছিল না। কিম জং উনের পরিবার প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে উত্তর কোরিয়া শাসন করছে। এই সময়ে হাজার হাজার কোটি ডলার তারা খরচ করেছে তাদের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত তৈরিতে। তারা মনে করে পারমাণবিক অস্ত্র তাদের রাষ্ট্রের সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এর আগেও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কথা রাখেনি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম শিকাগো ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৪ সালে পারমাণবিক অস্ত্র গবেষণা বন্ধ করে দেয়ার ওয়াদা করলেও তারা তা মেনে চলেনি। ১৯৯৯ সালেও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা বন্ধ করে দেয়ার চুক্তি করেছিল দেশটি। কিন্তু ২০০৬ সালে সে চুক্তি ভেঙে আবারও দূর পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র গবেষণা শুরু করেছিল তারা। এরপর থেকে দেশটি একদিকে যেমন প্রায় ৬০ টি পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়েছে, অন্যদিকে তেমন বিভিন্ন রকম ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ চালিয়েছে। শিকাগো ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার কাছে এমন ক্ষেপণাস্ত্র আছে যা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের ৩ জন প্রেসিডেন্ট—বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ এবং বরাক ওবামা— উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন।

লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসে প্রকাশিত নিবন্ধে আশার কথা যেটুকু বলা হয়েছে তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। যেহেতু কিম জং উন নিজেও রাষ্ট্র ক্ষমতায় নবীন এবং ট্রাম্পও কয়েক বছর আগে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, সেহেতু অচলবস্থা ভাঙতে কিছু একটা করার জোরালো চেষ্টা করবেন তারা দুজনই। তাছাড়া আগের চেয়ে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে আশঙ্কা আরও বেশি জোরালো হয়েছে। দেশটি গত বছর সফলভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের তাড়নাও আগের চেয়ে অনেক বেশি। হয়তো শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র কোরিয়া যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির জন্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করবেন এবং যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠনকে সাহায্যকারী দেশের তালিকা থেকে উত্তর কোরিয়ার নাম প্রত্যহার করে নেবে। বড়জোর দুই দেশ কূটনৈতিক স্বীকৃতির অংশ হিসেবে লিয়াজোঁ অফিস খুলতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য উত্তর কোরিয়াকে সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক অস্ত্র মুক্ত করা। তিনি বলেছেন, সম্মেলন সফল হবে কি হবে না, তা তিনি সম্মেলন শুরুর প্রথম মিনিটেই বুঝতে পারবেন। সম্মেলনের বিষয়ে আশাবাদী হওয়া না গেলে তিনি নিজেই সম্মেলন ত্যাগ করে বেরিয়ে যাবেন। উপদেষ্টারাও তাকে কোনও ছাড় দিতে নিষেধ করেছেন। সেক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো: উত্তর কোরিয়া সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে রাজি হবে কিনা। কেন উত্তর কোরিয়া সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়নি বা কেন ভবিষ্যতেও তাদের রাজি হওয়ার সম্ভাবনাও কম সে বিষয়ের ব্যাখ্যায় সিনেটর থমাস ব্রায়ান্ট কটন সিরিয়া প্রসঙ্গকে সামনে এনেছেন। পারমাণবিক অস্ত্র যে চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দেয় তা সিরিয়ার বাসার আল আসাদ ঠেকে শিখেছেন এবং উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন সিরিয়ার পরিণতি দেখে শিখেছেন! সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিদ্রোহী অধ্যুষিত এলাকায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করার অভিযোগে সিরিয়াতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এটা দেখে উত্তর কোরিয়ার ভেবে নেওয়ার সম্ভাবনা আছে, পারমাণবিক অস্ত্র থাকলে এভাবে সিরিয়াকে হামলার শিকার হতে হতো না। উত্তর কোরিয়া এটা দেখেই শিখবে, হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকাটা জরুরি।

কিম জং উন সম্পূর্ণভাবে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে সদিচ্ছার কথা জানালেও, বাস্তবে সেরকম প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। এর মধ্যে উত্তর কোরিয়া বড় জোর পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন কিছুটা সীমিত করবে। আর সেক্ষেত্রে তা ট্রাম্পের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করলেই যে যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে না সে বিষয়েও প্রমাণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিষয়ে বিশ্বাস করাটা একটু কঠিন। ওবামা আমলে ইরানকে পরমাণু অস্ত্র গবেষণা ত্যাগের শর্ত দেওয়া হয়েছিল। ইরানও তাদের বেশিরভাগ পারমাণবিক অস্ত্র গবেষণাগার বন্ধ করে দিতে রাজি হয়েছিল। এমন কি নিরীক্ষার জন্য তারা বিশেষজ্ঞদের প্রবেশাধিকার দিতেও সম্মত হয়েছিল। জাতিসংঘের পরিদর্শকরাও নিশ্চিত করেছে, যে ইরান পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে দেওয়া শর্ত মেনে চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পেয়েছে উল্টো ফল। ইরানি পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। উত্তর কোরিয়ার জন্য শিক্ষা এটাই, এক প্রেসিডেন্ট রাজি হলেও পরের প্রেসিডেন্ট অন্য কিছু চিন্তা করতে পারে।

তারপরও শেষ পর্যন্ত যদি উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে রাজি হয়ে যায়, তাহলেও কথা থাকে তাদের পাল্টা প্রত্যাশা নিয়ে। উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন সরকারকে স্বীকৃত দেওয়া ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার চেয়েও বেশি কিছু দাবি করতে পারেন কিম জং উন। শিকাগো ট্রিবিউনের সম্পাদনা পরিষদের সদস্য স্টিভেন চ্যাপম্যান লিখেছেন, ‘এই রকম দর কষাকষিতে বড় ত্যাগ ছাড়া বড় কিছু পাওয়াও যায় না।’ এখন প্রশ্ন: সম্মেলন সফল করতে যুক্তরাষ্ট্রের সব শর্ত কি আদৌ মেনে নেবে উত্তর কোরিয়া? যেটুকুও বা মেনে নেবে, তাতে কি সন্তুষ্ট হতে পারবেন ট্রাম্প? আর যদি সব মার্কিন শর্ত উত্তর কোরিয়া মেনেও নেয়, তাহলে তার বদলে কিম যা যা চাইবেন তা কি দিতে রাজি হবেন ট্রাম্প? প্রয়োজনীয় ‘বড়’ আপোষের কতটুকু বাস্তবে দেখা যাবে তার ওপর নির্ভর করছে ট্রাম্প-কিম সম্মেলনের সফলতা।

  

Post Your Comment