আজ সোমবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ |
Search

প্রচ্ছদ মুক্তবাক বিকৃত সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা ও নপুংসক এক সভ্যতা

১৩৭  বার পড়া হয়েছে

বিকৃত সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতা ও নপুংসক এক সভ্যতা

অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান রাহীল | ৬:০১ অপরাহ্ন, ৮ অক্টোবর, ২০১৭

  

chahida-news-1507464066.jpg

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা হতে শুরু করে মিডিয়া কিংবা সরকারি প্রচারণা সর্বত্র একটা জিনিস শেখানো হয় যে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস এইসব বিষয় কেবলই মধ্যযুগ কিংবা তার পূর্ববর্তী সময়ে অধিক ছিল। এখন বিজ্ঞানের যুগ তাই সবকিছু বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় পরিষ্কার দেখা যায়।

অতএব এখন সবাই জেনে বুঝে বিশ্বাস করে। আর কুসংস্কার তো কেবল গ্রামাঞ্চলে কিছু আছে। কেবল ধর্মান্ধ হুজুর নামক অন্য গ্রহের প্রাণিরাই এর চর্চা করে।

এইখানে প্রথম যে ভুলটা করা হয় তা হল, বিজ্ঞান কোনো আধুনিক জিনিস নয় যা কেবল এই সময়েই আকাশ হতে নাজিল হয়েছে। মূলত বিজ্ঞান হল, ‘পরীক্ষা নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ ও পদ্ধতিগতভাবে লদ্ধ সুশৃঙ্খল জ্ঞান এবং এই জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি।’ সৃষ্টির শুরু হতেই এই পরীক্ষাগত জ্ঞান মানুষ ধীরে ধীরে অর্জন করা শিখেছে, সময়ের ব্যবধানে যার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে।

তবে মহাবিশ্বের সিকিভাগ জ্ঞানও যে এখনও মানুষ নিজের মস্তিষ্কে ধারণ করতে পারেনি তা বলাই বাহুল্য। বরং এই বিজ্ঞানকেই এক নতুন কুসংস্কারের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। ঘটনাটা এমন হয়ে গেছে যে কেহ যদি বলে জীন কিংবা ফেরেশতা আছে। তাকে কিছু লোক হেসে উড়িয়ে দেবে। কিন্তু যদি বলা হয় আমি একটি সায়েন্টিফিক ভুত দেখেছি তবে অনেকেই একে সত্যি ভেবে ভুতের রং রূপ জিজ্ঞাসা করা শুরু করবে। আবার বিজ্ঞানভিত্তিক কল্পকাহিনী মানুষ অনেকটাই বিশ্বাস করে বসে। তাই অতিরিক্ত নাক, কান, লেজসমৃদ্ধ ‘এভাটার’ সিনেমার চরিত্রগুলো সবাই উত্তমরূপে গেলে। এখন তো হুজুরগণও বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে, ‘নূরানী কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে কোরআন শিক্ষা দেওয়া হয়’।

আধুনিকতা জিনিসটা কেবলই সময়ের ব্যবধান আর জীবনযাত্রার কিছু উপকরণের আধিক্য বৈ কিছু নয়। চমৎকার পদ্ধতিতে রান্না মানুষ হয়ত এখন করে, কিন্তু ওই রান্না করা খাবার হাজার বছরের পুরনো মুখ দিয়েই প্রবেশ করায়। পাতার তৈরি ঘরে, খেজুর পাতার চাটাইয়ে বসে যে ‘দারুন নদওয়া’ নামক সংসদ আরবে ছিল, বর্তমানেও আছে কেবল পাতার জায়গায় ইট পাথরের দালান তৈরি হয়েছে। কিম্ভূতকিমাকার বস্ত্র পরিহিত গ্রীক কিংবা রোমানগণ যে পদ্ধতিতে শাসন করত, এখনও সেই হাজার বছর পুরনো আইন কপচানো হয়। খালি আদালত ভবনের সাইজ পাল্টাইয়া গেছে। মজার ব্যাপার হল নগ্ন থাকবার যে সংস্কৃতিকে হাজার বছর আগের স্মার্ট তরুণগণ ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। তা আবার আধুনিকতার নামেই নতুন করে শুরু করা হয়েছে।

মূলত এভাবেই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় অন্ধবিশ্বাস আমরা করি তা হল, ‘আমরা আধুনিক তাই বেশি বুঝি’।

সৌন্দর্যের কোনো মাপকাঠি মানুষ মায়ের গর্ভ হতে শিখে আসেনা। তাই দেখা যায় এই জিনিসটা পুঁজি করে কিছু লোক ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মানদণ্ড ঠিক করে দেয়। এই যেমন কিছুদিন সাদা ফর্সা ত্বক সুন্দর বলা হল তো কিছুদিন পর বলা হল ত্বকে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মত পিঙ্কি পিঙ্কি ভাব না থাকলে ঠিক সুন্দর বলা যাবেনা। কথা হল যে জিনিসের উপর আমাদের কারোর নিয়ন্ত্রণ নেই তার কোনো মানদণ্ড থাকতে পারে না। মরগান ফ্রিম্যান যেমন টম ক্রুজ এর ন্যায় ফর্সা ত্বক পাবেনা, তেমনি মুশফিকুর রহিম কখনও ক্রিস গেইলের ন্যায় লম্বা হতে পারবে না। আফ্রিকান অঞ্চলে বিউটি সোপের বিজ্ঞাপনের ডায়লগ হল, ‘for smooth, flawless and glowy skin.’ ওই অঞ্চলে ভুলেও তারা ফর্সা হবার কথা উচ্চারণ করে না।

আধুনিকতার ধ্বজাধারীগণ যে জগতে বসবাস করে তা সম্পর্কে আমাদের সুস্থ ভগিনীগণের অনেকের প্রবল আগ্রহ দেখা যায়। মানে তারাও ওই রকম হতে চায়। তাই সবজি না খেয়ে বদনে ঘষে কিংবা আমিষ বর্জন করে তেলতেলে বদনের হাড্ডিসার রূপসী হবার চায়। কারণ দেহে চর্বি থাকলে সুন্দরী হওয়া যাবে না। শরীরে চর্বি অবশ্যই কিছুটা দরকার তার উপর যতটুকু জানি নারীকুল সন্তান ধারণ করতে হয় বিধায় একটু বেশি ফ্যাট তাদের থাকতে হয় নয়ত ভবিষ্যতে পুষ্টিহীনতায় ভুগিতে হয় (ভুল হলে ডাক্তার ভ্রাতা ভগিনীগণ সংশোধন করে দিবেন)। আবার হাড্ডিসার দেহ আর তেলতেলে উজ্জ্বল ত্বক যে সুন্দরীর মাপকাঠি এও কিন্তু কোনো ধর্মগ্রন্থ হতে আসে নাই। মূলত ভোগবাদী সমাজ ইহা ঠিক করে দিয়েছে তাদের কিছু পণ্য বিক্রয় করবার মানসে। মার্কেটিং পলিসি বলা যায়। ‘rexia world’ নামক একটা ওয়েব সাইটে এইভাবে শিরোনাম লেখা আছে, ‘Thinner, Bonier and Closer to Perfection’. চিন্তাও করা যায়না কতটা ভয়াবহ এদের পরিপূর্ণতার ধারণা।

কিন্তু যেই পশ্চিম হতে এই সংস্কৃতি এসেছে সেখানকার বাস্তবতা হল এই beauty myth চর্চা করতে গিয়ে তাদের এক কঠিন রোগ হয় যার নাম anorexia nervosa. এই রোগের উপসর্গ বর্ণিত হয়েছে এভাবে, ‘an intense fear of gaining weight or becoming fat, even though underweight.’ এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে শুধুমাত্র আমেরিকার ১৫-৩০ বছর বয়সি মেয়েদের ১৩%। প্রিন্স উইলিয়ামের সাবেক দিল কি ধাড়কান, অভিনেত্রী ‘কাইরা নাইটলি’ এ রোগে আক্রান্ত। এত কষ্ট করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়েও কিন্তু ওই জগতে সফল হতে পারবে না। কারণটা তাদের মুখেই তো শুনেছেন যে শুটিংয়ের ফাঁকে আবহ সঙ্গীত বিশেষ লোকজনের মনোরঞ্জন ব্যতিত ছবি, বিজ্ঞাপন কিংবা অভিনেত্রী কোনটাই হিট হবে না। বলিউড অভিনেত্রী মমতা কুলকার্নি বলেছেন, ‘বলিউডে অভিনয় করে কেহ যদি সতীত্ব বজায় রাখতে পেরেছে প্রমাণ করতে পারে তবে আমি নগ্ন হয়ে মুম্বাই ঘুরব।’ বলাই বাহুল্য কেহ প্রমাণ করতে আসে নাই।

আজ এই নষ্ট সংস্কৃতি আমাদের সমাজে অবাধে প্রবেশ করেছে। পশ্চিমা ভোগবাদী, পণ্য বিক্রেতাগণ রমণীদের রোল মডেল ঠিক করে দিচ্ছে। তাই দেখা যায় ২০০২ সালের মিস ওয়ার্ল্ড তুরস্কের আজরা আকিনের মুখ হতে বের হয়, ‘I hope I will represent the women of the world in a good way. I am very honoured to be Miss World, I think it is good for a woman to have this position, and I hope

I can make a difference.’

আর এই সমস্ত তথাকথিত সম্মানিত আর গর্বিত রমণীগণ বলিউডের জিয়া খানের মতই গর্ভবতী অবস্থায় আত্মহত্যা করে যেই খবর অত বেশি প্রচার পায়না। পাবে কি করে পর্দার অন্তরালে কি হচ্ছে তা না দেখে আমরা তো পর্দায় তার ‘বিজলি কি চমক জ্যায়সা মুস্কুরাহাত’ দেখে বিলকুল ফিদা।

যৌনতা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে এ আর স্বাভাবিক কোনো মানবিক চাহিদায় সীমাবদ্ধ নাই। পশ্চিমা সমাজ একে শিল্পিত(!) রূপে পর্ণগ্রাফি আকারে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু মানব চরিত্রের অন্য সকল চাহিদার মত এরও নানা বৈচিত্র্য দরকার হল। তাই এখন স্বাভাবিক সেক্স আর ভাল লাগছে না। এক জঘন্য প্রজন্মের সৃষ্টি হল যারা সমলিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট। pedophilia কিংবা necrophilia (sexual sadism)র মত ভয়াবহ পর্ণগ্রাফি তৈরি হতে লাগল যাতে নারীদের জঘন্যতম উপায়ে নির্যাতন করা হয়। এই কর্মসমূহকে পুরুষত্বের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়। আর এ সমস্ত অতীব শক্তিমান পুরুষ আর নারীগণের উপর পুরুষত্বের পরীক্ষা দিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারল না। এইবার পুরুষ খুঁজতে লাগল, কুত্তা, ঘোড়া, গরু কিছুই বাদ দিল না। একই হারে বাড়তে লাগল সিফিলিস, গনোরিয়া আর এইডস।

অন্যদিকে রমণীগণ ফিগার ঠিক রাখতে বাচ্চা ধারণ করা বন্ধ করে দিল। আর এইভাবে ইউরোপ, আমেরিকায় জন্মহার কমতে লাগিল। বাধ্য হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ হতে গর্ভ ভাড়া (surrogated mother) করতে লাগল। এইভাবে বিকৃত রুচির রমণী আর নপুংসক পুরুষ সমৃদ্ধ এক সভ্যতার সৃষ্টি হল।

লেখক : আইনজীবী, চট্টগ্রাম জজ আদালত

  

Post Your Comment